চীন-মার্কিন উত্তেজনার প্রভাব

ঝুঁকি এড়াতে হংকং ছাড়ছে শিপিং কোম্পানিগুলো

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব এড়াতে তৎপর হয়েছে বেশকিছু শিপিং কোম্পানি।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব এড়াতে তৎপর হয়েছে বেশকিছু শিপিং কোম্পানি। তারা অনেকটা নীরবে হংকং থেকে নিজেদের কার্যক্রম সরিয়ে নিচ্ছে। পাশাপাশি হংকংয়ের পতাকা থেকে জাহাজগুলোর নিবন্ধন নিরপেক্ষ কোনো দেশে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। অঞ্চলটি থেকে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া অন্য কোম্পানিগুলোও বিকল্প পদক্ষেপ নিয়ে ভাবছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে রয়টার্স।

চীন-মার্কিন বিরোধ ও পারস্পরিক বাধা-নিষেধ আরোপ নতুন না হলেও হোয়াইট হাউজে জো বাইডেনের শেষ দিকে এ-সংক্রান্ত উদ্যোগ নতুন মাত্রা লাভ করে। এরপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে প্রায় দিনই নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে পরিস্থিতি। এর প্রতিক্রিয়ায় শিপিং কোম্পানিতে চীন নিয়ন্ত্রিত হংকং ছাড়ার তোড়জোর দেখা যাচ্ছে। তবে এ পদক্ষেপগুলো প্রচারের আলো পেয়েছে কম।

প্রতিবেদনে ছয়জন শিপিং নির্বাহীর বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, পদক্ষেপগুলোর পেছনে বড় ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। প্রয়োজনে চীন কর্তৃপক্ষ তাদের জাহাজ দখলে নিতে পারে অথবা যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য সংঘাতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার শিকার হতে পারে সংস্থাগুলো।

চীনের নিরাপত্তার স্বার্থে হংকংকে ব্যবহার করার ওপর জোর দিচ্ছে বেইজিং। এছাড়া চীনের বাণিজ্যিক নৌবহরের ওপর মার্কিন নজরদারি ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে তাইওয়ান নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে এমনটা দেখা যাচ্ছে। এসব কারণে শিপিং শিল্পের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

গত মাসে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় চীনা শিপিং কোম্পানি ও চীনে নির্মিত জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর ব্যবহারে উচ্চ ফি আরোপের প্রস্তাব দেয়। এর উদ্দেশ্য হলো, চীনের টার্গেটেড ডমিনেন্স বা লক্ষ্যভিত্তিক আধিপত্য মোকাবেলা।

হংকং ইস্যুতে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন নয়। গত সেপ্টেম্বরে হংকংয়ে ব্যবসা পরিচালনার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি সম্পর্কে মার্কিন ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে দেয় ওয়াশিংটন। অঞ্চলটিতে সরকারি দমন অভিযানে জড়িত কর্মকর্তাদের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে।

এশিয়ায় বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে হংকং বরাবরই গুরুত্ব পেয়েছে। এক শতকেরও বেশি সময় ধরে অঞ্চলটি জাহাজ মালিক, ব্রোকার্স, লগ্নিকারী, বীমা কর্মকর্তা ও আইনজীবীদের ব্যবসার জন্য পরিচিত। সরকারের তথ্যানুযায়ী, সামুদ্রিক ও বন্দর শিল্প ২০২২ সালে হংকংয়ের জিডিপিতে ৪ দশমিক ২ শতাংশ অবদান রেখেছে।

ভেসন নটিক্যালের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্রিক তথ্যসংস্থা ভেসেলসভ্যালুর তথ্য অনুসারে, বিশ্বব্যাপী জাহাজের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে হংকংয়ের পতাকা অষ্টম সর্বাধিক ব্যবহৃত।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে রয়টার্স দুই ডজন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছে। যাদের মধ্যে শিপিং নির্বাহী, বীমা কর্মকর্তা ও হংকং-সংক্রান্ত আইনি বিশেষজ্ঞরা অন্তর্ভুক্ত। তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সামরিক সংঘাত শুরু হলে বাণিজ্যিক সামুদ্রিক কার্যক্রম নতুন ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। যেখানে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন ব্যক্তিরা একাধিক বিষয় তুলে ধরেছেন। যেমন চীনের জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয় অঞ্চলটিতে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, যা শিপিং ব্যবসাকে ঝুঁকিপূর্ণ করতে পারে। পাশাপাশি চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সংঘাত তাদের সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। এছাড়া জরুরি পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে বেইজিংয়ের ওপর নির্ভর করেন হংকংয়ের নেতারা। এসব কারণে তারা জাহাজ সরিয়ে নিতে চান। একজন নির্বাহী বলেন, ‘আমরা এমন অবস্থানে থাকতে চাই না, যেখানে চীন আমাদের জাহাজ চেয়ে বসবে এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের লক্ষ্যবস্তু করবে।’

শিপিং মালিকদের উদ্বেগ ও হংকং থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়ার এ পদক্ষেপ আগে গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অঞ্চলটির ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ ধীরে ধীরে বেড়েছে। প্রধান কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, হংকংয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো কঠোর হয়ে উঠেছে। হংকংয়ের ওপর চীনা নিয়ন্ত্রণ বিশেষ করে ২০১৯ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পর থেকে আরো দৃঢ় করেছে। জাতীয় নিরাপত্তা আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে চীন কড়া নিরাপত্তা নীতি প্রয়োগ করছে, যা ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

একই সঙ্গে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমাগত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও ভূরাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে, যা হংকংকেও প্রভাবিত করছে। এ পরিস্থিতিতে শিপিং মালিকরা মনে করছেন যে হংকংয়ের সঙ্গে সংযুক্তি থাকলে তারা অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারেন। তাই তারা এ ঝুঁকি কমানোর জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। অর্থাৎ হংকংয়ে শিপিং বাণিজ্যের ঝুঁকি বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে।

বাণিজ্যিক জাহাজকে একটি নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের সঙ্গে নিবন্ধন বা পতাকা সংযুক্ত করতে হয়, যাতে তারা নিরাপত্তা ও পরিবেশগত নিয়মকানুন মেনে চলতে পারে। চীন পরিচালিত অনেক জাহাজ হংকংয়ের নিবন্ধিত হয়েছে। তবুও স্বতন্ত্র বিশ্লেষণ অনুসারে, হংকংয়ের পতাকাবাহী সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা কমছে। গত চার বছরে ৮ শতাংশের বেশি কমে জানুয়ারিতে ২ হাজার ৩৬৬-এ নেমে এসেছে, যেখানে আগে ছিল ২ হাজার ৫৮০টি। সরকারি তথ্যেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।

আরও